মাকসুদুল আলম

সোনালি আঁশের সাথে যে নামটি এখন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে তিনি বিজ্ঞানী ড.মাকসুদুল আলম। পাটের জিনের নকশার পাশাপাশি তিনি রাবার এবং হাওয়াইয়ান পেঁপের জিনের নকশার আবিষ্কারক। যা তাকে দেশে বিদেশে পরিচিত করে তোলে একজন প্রতিভাবান জিনতত্ত্ববিদ হিসেবে।

এই দেশে বিদেশে সমাদৃত মানুষটির জন্ম ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৫৪ সালে ফরিদপুর জেলায়। তার পিতা দলিলউদ্দিন আহমেদ ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের একজন কর্মকর্তা এবং মা লিরিয়ান আহমেদ ছিলেন সমাজকর্মী ও শিক্ষিকা।

ছোটবেলা থেকেই মাকসুদুল আলমের ছিলো বিজ্ঞানের প্রতি অদম্য আগ্রহ। তিনি ভাই এবং বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাব, যার কাজ ছিলো গাছের পাতা পর্যবেক্ষণ ও সংগ্রহ এবং চারাগাছ লাগানো। সংগ্রহ করা পাতাগুলো অ্যালবামে সাজিয়ে তিনি খুঁজে বের করতেন সেসবের বৈজ্ঞানিক নাম। সেই চারাগাছ রোপনের ক্লাবই হয়ত তার মনে বিজ্ঞানের আলোকিত রহস্যের বীজ বপন করে দিয়েছিলো সেই ছোটোবেলাতেই।

ড.মাকসুদুল আলমের শিক্ষাজীবন ছিল অনেক সমৃদ্ধ। তিনি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। স্বাধীনতার পর মাকসুদুল আলম উচ্চ শিক্ষার জন্য রাশিয়া চলে যান এবং সেখানে মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে মাইক্রোবায়োলজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এবং একই বিদ্যাপীঠ থেকে ১৯৮২ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি জার্মানিতে চলে যান এবং বিখ্যাত ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৮৭ সালে বায়োকেমিস্ট্রিতে আরেকটি পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

মস্কোতে শিক্ষাজীবনে তিনি সংস্পর্শে আসেন ভ্লামিদির পেত্রোভিচ মুলাচেভের। পেত্রোভিচ বায়োকেমিস্ট্রির বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখার জন্য বিখ্যাতআবার জার্মানিতে তিনি কাজ করার সুযোগ পান বায়োকেমিস্ট্রির দুইজন বিখ্যাত গবেষক ডিয়েটার ওয়স্টারহেল্ট ও জেরাল্ড হেজেলবাউয়ের সাথে। জার্মানির পর ড.মাকসুদুল আলম যোগ দেন হাওয়াই ইউনিভার্সিটিতে, মেরিন বাই প্রডাক্ট ইঞ্জিনিয়ারিং সেন্টারের সহকারী পরিচালক ছিলেন তিনি সেখানে। সে সময় তিনি ও তার সহকর্মীগণ যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ লাখ ডলার অনুদান পেয়েছিলেন। ১৯৯২ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবায়োলজির সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ২০০১ সালে হয়েছেন অধ্যাপক। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে অধ্যাপক হিসেবে কাজ করে গিয়েছেন।

মেরিন বাই প্রডাক্ট ইঞ্জিনিয়ারিং সেন্টারে কাজ করার সময় তিনি ও তার সহকর্মী ২০০০ সালে প্রাচীন জীবানুতে মায়োগ্লোবিনের মত এক নতুন ধরনের প্রোটিন আবিষ্কার করেন, যা তাকে প্রাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। হাওয়াইয়ান পেঁপের জিনের নকশা উন্মোচনের পর তিনি স্থান পান বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারের প্রচ্ছদে। এরপর মালয়েশিয়ায় ডাক পেয়ে উন্মোচন করেন রাবারের জিনের নকশা। তাঁর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডাটাসফটের একদল উদ্যমী গবেষকের যৌথ প্রচেষ্টায় ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময় সফলতার সাথে আবিষ্কার করেন পাটের জিনের নকশা। বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে তার এই অসামান্য অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদক প্রদান করে।

২০১৪ সালের ২০ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ের কুইনস মেডিকেল সেন্টারে যকৃতের জটিলতা জনিত কারণে এই প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর মৃত্যু ঘটে।